মুক্তছন্দ : অনুশাসন নয়, অনুভব
হোসেইন আজিজ
কবিতা বলতে অনেকেই অন্ত্যমিল আর ছন্দের খেলাকেই বুঝে থাকেন। আবার অনেকে মনে করেন– ছন্দ মানেই অন্ত্যমিল আর মাত্রার সুনির্দিষ্ট কাঠামো। কিন্তু আধুনিক কবিতা, বিশেষ করে মুক্তছন্দ এই ধারণাকে উপেক্ষা করে বলছে – ছন্দ বাহিরে নয়, ভেতরে।
মুক্তছন্দ অন্ত্যমিলকে অস্বীকার করে না আবার অন্ত্যমিলে নির্ভরও করে না। তার নিজস্ব ছন্দ রয়েছে। এ ছন্দ একটি অভ্যন্তরীণ সুর ও গতির অনুভব। যা চোখে পড়ে না কিন্তু পাঠকের মনে, কানে, অনুভবে বাজতে থাকে। এটি অনুভবের এমন দোলা যা শৃঙ্খলাবদ্ধ না হয়েও পাঠকের হৃদয়ে অনুরণন তোলে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন –
“ছন্দ থাকুক, কিন্তু যেন ছন্দের কথা মনে না পড়ে।”
রবীন্দ্রনাথের এই উক্তির মধ্যেই নিহিত আছে মুক্তছন্দের সারকথা। ছন্দ তখনই সফল হয়, যখন তা নিজের অস্তিত্বকে আড়াল করে শুধু আবেগের প্রবাহে উদ্বেলিত হতে পারে। ছন্দ মানে কেবল মাত্রা, অক্ষর বা অন্ত্যমিল নয়। ছন্দ হচ্ছে কবির অন্তর্জগৎ থেকে আসা একটি প্রবাহ, একধরনের সংগীত। মুক্তছন্দ সেই অন্তর্জগতের বহিঃপ্রকাশ– যা অনুভবকে বাঁধনে আটকায়, নিয়মকে নয়।
ভারতীয় কাব্যতত্ত্ব ছন্দকে বলছে “চন্দঃ”, যার অর্থই হলো ‘দোলন’ বা ‘কম্পন’। গীতগোবিন্দ থেকে গীতাঞ্জলি পর্যন্ত ছন্দের বিবর্তনে দেখা যায় – ছন্দ বাহ্যিক বিষয় না হয়ে অন্তরের ধ্বনি হয়ে উঠেছে।
আসা যাক অন্ত্যমিলের কথায়। প্রাচীন কাব্যে অন্ত্যমিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও আধুনিক কবিতায় তার অবস্থান বদলে গেছে। মুক্তছন্দে অন্ত্যমিল বাধ্যতামূলক নয়। এটি একটি অলংকার মাত্র। অনেক সময় অন্ত্যমিল একটি কথার ভেতরে সংবেদনশীল ধ্বনি- প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করে, তাই এটি প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। আবার কখনো এড়িয়ে যাওয়া হয়, পাঠকের মনে একধরনের ” তৃষ্ণা”, “অপূর্ণতা” বা “বিচ্ছিন্নতা” জাগিয়ে তোলার জন্য। সেই বিচ্ছিন্নতাই কবিতার ভেতরের সত্যকে প্রকটিত করে। রাশিয়ান সাহিত্য তাত্ত্বিক ভিক্টর বোরিসোভিচ শক্লোভস্কি বলেছিলেন –
“Art exists that one may recover the sensation of life; it exists to make one feel things, to make the stone stony.”
অর্থাৎ, মুক্তছন্দে অন্ত্যমিলের সচেতন ব্যবহার দৃশ্যমান বা স্পষ্টকরণের একটি কৌশল মাত্র।
মুক্তছন্দের ছন্দ আসে ভাবনা, বাক্যের স্থাপত্য, ধ্বনির পুনরাবৃত্তি ও ছেদ এবং নিরবতা থেকে। ভাবনা থেকে প্রশ্ন, প্রতীক্ষা অথবা বিপর্যয়; যেখানে অনুচ্চারিত অনুভব সুরময় হয়ে ওঠে। বাক্যের স্থাপত্যে থাকে – কোথায় থামবে, কোথায় চলবে, কোথায় হঠাৎ ভেঙে পড়বে। সেই বিন্যাসেই আসে গতিশীলতা। কোনো শব্দের পুনঃপ্রয়োগ কিংবা একটি হঠাৎ বিরতি, পাঠকের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে। মাঝে মাঝে একটি বিরতি বা শূন্যস্থান শব্দের চেয়ে বেশি বলিয়ে দেয়।
উদাহরণস্বরূপ নিচের পংক্তিগুলো দেখা যেতে পারে:
“সময় পলাতক হলে ট্রেন থামে ইস্টিশনে,
আঁধার কেটে কেটে পৌঁছে যাই তোমার বাড়ি,
আমাকে স্বাগত জানায় বন্ধ কবাটের নির্দয় তালা।”
এখানে অন্ত্যমিল অনুপস্থিত, কিন্তু বাক্যের গতি, বিরতি এবং বিষাদের সুর এক গভীর ছন্দ তৈরি করেছে। এটি পাঠকের অনুভবে অনুরণিত হয়, একটি অদৃশ্য সংগীতের মতো।
অনেকে মনে করেন মুক্তছন্দ মানে এলোমেলো শব্দচয়ন। কিন্তু প্রকৃত মুক্তছন্দ সর্বাংশে সংগঠিত। এটি বাহ্যিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেও একধরনের নিয়ম তৈরি করে। এখানে ছন্দ মানে – শব্দের ঘনত্ব, ভাবের ছায়া, আবেগের রেখাচিত্র এবং অভ্যন্তরের গতি।
আধুনিক কবিতার প্রবক্তারা ছন্দকে অনুশাসনের পরিবর্তে একটি অনুভবের কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করেছেন। টি. এস. ইলিয়ট তাঁর “The Music of Poetry” প্রবন্ধে বলেছেন –
“No verse is free for the man who wants to do a good job.”
অর্থাৎ, মুক্তছন্দ নামক স্বাধীনতা আসলে এক গোপন শৃঙ্খলা, যা শব্দ, অর্থ ও অনুভবের গভীরে নিহিত।
মুক্তছন্দ ছন্দকে অস্বীকার করে না — সে ছন্দকে মুক্ত করে। এখানে অন্ত্যমিল থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কবিতাটি ভেতর থেকে বাজতে হবে।
একটি সফল মুক্তছন্দ পাঠকের মনে যে দোলন সৃষ্টি করে তার উৎস কোনো দৃশ্যমান কাঠামো নয়, বরং এটি কবির অন্তর্লোকের সংগীত। কবির অন্তর্লোকের সংগীত যদি পাঠকের অন্তর্লোকে অনুরণিত হয় — তাহলে সেটাই ছন্দ, সেটাই কবিতা।
হোসেইন আজিজ
কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক
কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক
বিয়ানীবাজার, সিলেট।
উৎস: Nishinile



